শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্স, ইজিবাইক ও ভ্যানে আসছে রোগী

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৯ জুলাই, ২০২১
  • ১১
কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্স, ইজিবাইক ও ভ্যানে আসছে রোগী

খুলনা করোনা হাসপাতাল

স্টাফ রিপোর্টার

ঘড়ির কাটায় বেলা ১১টা ছুঁই ছুঁই। খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল থেকে লাশবাহী একটি গাড়ি দ্রুত বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল একটি অ্যাম্বুলেন্স। তড়িঘড়ি নেমে একজন ভেতরে ঢুকলেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল একজন বয়স্ক মানুষ ভীষণভাবে চেষ্টা করছেন বাতাস থেকে শ্বাস নেওয়ার। আরেকজন পাশে বসে তাঁর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। যিনি ভেতরে গিয়েছিলেন, তিনিও ফিরছেন না।

এর মধ্যে মিনিট বিশেক সময় পার হয়ে গেছে। শ্বাসকষ্ট বেড়েই যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সে সিলিন্ডার থাকলেও তা কেউ লাগাচ্ছেন না। আগের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ড্রাইভার অক্সিজেন লাগাতে নারাজ। এরই মধ্যে হাসপাতালের এক নারী কর্মী এসে ড্রাইভারকে ধমকে নিজেই অক্সিজেনের নল লাগিয়ে দিলেন। পকেট থেকে অক্সিমিটার বের করে রোগীর হাতে লাগিয়ে দেখলেন, তাতে পালস পাচ্ছিলেন না। একজন চিকিৎসক নার্সকে ডেকে নেন তিনি। সবাই মিলে ওই রোগীকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যান।

এরও মিনিট পনেরো পর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন ওই রোগীর ছেলে জহিরুল ইসলাম। মুখে কিছুটা স্বস্তির ভাব। কথা বলে জানা গেল, গত রোববার থেকে জ্বর-সর্দির পাশাপাশি বমির ভাব ছিল তাঁর বাবা ওমর আলীর। বৃহস্পতিবার সকালে যশোরের নওয়াপাড়া থেকে খুলনায় এনে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়েছিলেন। তখন স্যাচুরেশন ছিল ৭৫। সেখান থেকে খুলনা মেডিকেলে পাঠানো হয়। মেডিকেলের জরুরি বিভাগ থেকে আবার পাঠানো হয় কোভিড ইউনিটে। এখানে এসে কোথায় কীভাবে কথা বলতে হবে, বুঝতে পারছিলেন না। পরে ওই নারী কর্মীর সহায়তা নেন। ভর্তির পর ভেতরে নিয়ে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়ার কিছু পর অক্সিজেনের লেভেল অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানান তিনি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ পরিচালিত করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ১৩০ শয্যার। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯৩ জন। তাঁদের মধ্যে করোনা পজিটিভ রোগী ১২৯ জন, উপসর্গ নিয়ে ২৫ জন, আইসিইউতে ১৯ জন এইচডিইউতে ২০ জন আছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার কিছু আগে ইজিবাইকে করে বিছানাপত্র নিয়ে হাসপাতালে আনা হয় খুলনার আড়ংঘাটার বেবি রহমানকে (৫৭)ভর্তি করানোর জন্য ছেলে ভেতরে গেছেন। এরই মধ্যে শ্বাসকষ্ট আরও তীব্র হতে থাকে। নাতি মাশফির নানিকে ধরে বসে ছিলেন। বেবি রহমান বিরামহীনভাবে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিলেন। তাঁর কণ্ঠ অনেকটা জড়িয়ে আসছিল। নাতির চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছোটখাটো একটা জটলা পাকিয়ে ফেলেন। ঘটনা দেখে নিজে থেকেই নেমে আসেন আগের সেই নারী কর্মী। অক্সিজেন লেভেল মেপে দেখেন ৫১। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে নিয়ে গেলেন তিনি।

ওই নারী কর্মীর নাম অপূর্বা রায়। পদবি আয়া। বললেন, ‘গ্রাম থেকে আসা রোগীর স্বজনেরা এসে বুঝতে পারেন না। আমরা সব সময় সাহায্যের চেষ্টা করি।’

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত অবস্থানের সময় হাসপাতাল থেকে তিনটি মরদেহ বের করতে দেখা গেছে। বেলা একটার দিকে একটি মরদেহ গাড়িতে তোলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্বজনেরা। গতকাল বুধবার রাতে বটিয়াঘাটার শিয়ালিডাঙ্গা থেকে জিনাত আলী ফকির নামের ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তাঁর ছেলে মো. জাকারিয়া বলেন, ‘আমার মতো অনেকের নিয়তিই এখন রকম। বাবা খুব বেশি অসুস্থ ছিল না। এখনো পরীক্ষার ফলও হাতে পায়নি। হাসপাতালে ১২-১৩ ঘণ্টা থাকার অভিজ্ঞতায় বলব, এখানকার সেবা অনেক ভালো। তবে শৌচাগারের দুর্ভোগের বিষয়টি যদি কর্তৃপক্ষ একটু আমলে নেয়, তাহলে ভালো হতো।’

সাড়ে তিন ঘণ্টা অবস্থানের সময় দেখা গেছে, কিছুক্ষণ পরপর অ্যাম্বুলেন্স, ইজিবাইক, এমনকি ভ্যানে করেও রোগীরা এসেছেন। কারও করোনা পজিটিভ, কেউ উপসর্গ নিয়ে। অনেকের সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। অনেকের ছিল না। হাসপাতালের আসা ভর্তির মাঝখানের সময়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসেই অক্সিজেন নিতে দেখা গেছে বেশির ভাগ রোগীকে।

হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, মেঝেতে রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে কিছুটা কম। মেঝেতে-শয্যায় প্রায় সবারই অক্সিজেন লাগছে। ৭৭টি শয্যায় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। বাকিগুলো চলছে সিলিন্ডার অক্সিজেনে।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে যশোরের নওয়াপাড়া থেকে আসা ওমর আলীকে ভর্তির জন্য অ্যাম্বুলেন্সেই অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। অবস্থা গুরুতর দেখে এগিয়ে এসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। আজ বৃহস্পতিবার খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে যশোরের নওয়াপাড়া থেকে আসা ওমর আলীকে ভর্তির জন্য অ্যাম্বুলেন্সেই অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। অবস্থা গুরুতর দেখে এগিয়ে এসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। আজ বৃহস্পতিবার খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে।ছবি: সাদ্দাম হোসেন

খুলনায় করোনার সংক্রমণ মৃত্যু কমছে না। আজ খুলনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৩৮ জনের। মারা গেছেন ২১ জন। শনাক্তের হার ৩৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

খুলনা মেডিকেল কলেজ পরিচালিত করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ১৩০ শয্যার। প্রায় মাসখানেক ধরে আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আরও দুটি হাসপাতাল হয়েছে। তবুও চাপ কমেনি। কতকাল সকাল থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯৩ জন। তাঁদের মধ্যে করোনা পজিটিভ রোগী ১২৯ জন, উপসর্গ নিয়ে ২৫ জন, আইসিইউতে ১৯ জন এইচডিইউতে ২০ জন আছেন।

হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘আমাদের ২০টা (আইসিইউ) আছে, আবু নাসের হাসপাতালে নতুন ১০টা চালু হয়েছে। তবে সব শয্যাই পূর্ণ থাকে। প্রতিদিন আরও ১৫-২০ জনের আইসিইউ দরকার হয়। তবে আমরা পারছি না। অনেককে অপেক্ষায় রাখতে হচ্ছে। হাই ফ্লো দিয়ে আবার অক্সিজেন ফ্লো বাড়িয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।’

দিলীপ কুমার কুণ্ডু আরও বলেন, হাসপাতালে ১০ হাজার কিলোলিটারের একটি অক্সিজেন ট্যাংক আছে। পাশাপাশি আরেকটি প্ল্যান্ট বসানোর কাজ চলছে। ওই কাজ দ্রুত শেষ হওয়া দরকার। প্রতিদিনই ট্যাংকে অক্সিজেন রিফিল করা লাগছে। রিফিলের জন্য যদি কখনো গাড়ি আসতে না পারে, তাহলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।


Post Views:
1



Source by [সুন্দরবন]]

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ এই ক্যাটাগরি
সুন্দরবন টোয়েন্টিফোর ডট কম, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত - ২০২১
Designer: Shimulツ
themesba-lates1749691102