বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১০:২০ অপরাহ্ন

রেস্টুরেন্ট কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম |

  • Update Time : মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১


বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি্খাতের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিবছর কৃষি খাত একটি অন্যতম ,প্রধান খাত হিসেবে জিডিপিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। বিবিএসের তথ্যমতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। কৃষি খাতের অন্যান্য প্রধান উপখাতগুলোর মধ্যে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, পোল্ট্রি, ডেইরি অন্যতম। যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির বিভিন্ন উপখাতের সমৃদ্ধিতে হোটেল- রেস্টুরেন্ট এর ভূমিকা অপরিসীম।

বিগত কয়েক বছরে ব্যাক্তি উদ্যোগে দেশে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক রেস্টুরেন্ট। Burger King, KFC, Pizza Hut, Pizza Inn, bb.q Bangladesh সহ বিশ্বের প্রায় আড়াই শতাধিক নামি দামি ফ্র্যাঞ্চাইজি রেস্টুরেন্টের শাখা গড়ে উঠেছে এখানে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখরোচক খাবার ও তার সুন্দর পরিবেশনার পাশাপাশি মনোরম পরিবেশের মাধ্যমে বিনোদন ও নিরিবিলি আড্ডার ব্যবস্থা থাকায় রেস্তোরাঁগুলো শুধু খাবারের দোকান ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে বিনোদনের আকর্ষণীয় স্থান।

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহকরনের লক্ষ্যে গত এক দশকে ঢাকাসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার রেস্তোরাঁ। শুধু ঢাকাতেই আছে প্রায় ১০-১২টির মতো ফুড কোর্ট বা একসঙ্গে একাধিক খাবারের দোকান (জাগো নিউজ, ১৭ এপ্রিল ২০২১)

বিবিএসের ২০০৯-১০ অর্থবছরের জরিপ অনুযায়ী, দেশে এখন হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪,৩৬,২৭৪। যেখানে ২০০২-০৩ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ ১৫ হাজার ১০৩টি। অর্থাৎ গত কয়েক দশকে খুব দ্রুত হারে দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাত বড় হয়েছে (সমকাল, ১৩ জুন ২০২১)।

রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির তথ্যমতে, সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা শহর মিলে হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৬০ হাজার। হোটেল রেস্তোরাঁর সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী (প্রথম আলো, ২৯ জুন ২০২১)। শুধুমাত্র রাজধানীতে রেস্তোরাঁ রয়েছে প্রায় আট হাজার। যার মধ্যে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সাড়ে চার হাজার। উত্তর সিটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। রেস্তোরাঁগুলোতে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক কাজ করেন (জাগো নিউজ, ১৭ এপ্রিল ২০২১)

এদিকে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট সার্ভে-২০২০ শিরোনামের একটি জরিপে দেখা যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাতের আনুমানিক অবদান ছিলো প্রায় ৮৮৬৪৩.১ কোটি টাকা যা ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৩৫১৫৯.২ কোটি টাকা।

বিবিএসের তথ্যমতে, গত ১০ বছর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের অবদান বেড়েছে সাতগুণ। যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৭৫, ৯৪০ কোটি টাকা (সমকাল, ১৩ জুন ২০২১ )। এছাড়াও জিডিপিতে কৃষিখাতের যে অবদান ছিল সেখানে ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি ছিল হোটেল ও রেস্টুরেন্ট খাতে (বনিক বার্তা, ১২ আগস্ট ২০২)। আর এসব অবদানের পিছনে কৃষকদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ভুমিকা অপরিসীম। কেননা হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গুলোর খাবার মেন্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিপুল পরিমাণ কৃষিজ পণ্য। এসব কৃষিজ পণ্যের যোগান আসে এদেশের প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে।

সাধারণত কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ বা বিপণন বলতে আমরা পণ্য সামগ্রী ও সেবা উৎপাদন স্থান হতে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে যাবতীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বুঝে থাকি। কৃষিজ পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর পাশপাশি ফার্ম টু ডাইনিং কন্সেপ্ট সফলভাবে বাস্তবায়নে হোটেল-রেস্টুরেন্ট গুলো একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ কৃষিজ পণ্য উৎপাদন হয় তার একটি বড় অংশ দেশের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গুলোতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিছু কৃষিজ পণ্য সরাসরি ব্যবহার করা হয় আর কিছু পণ্য আছে যেগুলো বিভিন্ন প্রসেসিং ফুড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

দেশের আনাচে–কানাচে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজি ও স্ট্রিট ফুডের দোকান রয়েছে। যেগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে হোটেল- রেস্টুরেন্ট গুলোতে আমাদের দেশীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরণের সবজি, সালাদ উপকরণ, মাছ, মাংসসহ নানাবিধ কৃষিজ পণ্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও রেস্টুরেন্টগুলোতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক কৃষি পণ্যেরও চাহিদা আছে যেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করার মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হয়।

কৃষকের উৎপাদিত কৃষি পণ্যবাজারজাতকরণে বিদেশে রপ্তানি ছাড়াও দেশের এসব হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও বর্তমান সময়ে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ায় ক্রমাগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি (বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ আগস্ট ২০১৬)।

মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। যার কারণে এসেছে রুচি, খাদ্যাভ্যাস ও জীবন যাত্রার মানে ব্যাপক পরিবর্তন। এছাড়াও সামনের দিনগুলোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বাড়লে এ খাতের অবদান আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থান আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আগামীতে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের আরও বিকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এজন্য দরকার সঠিক ও বাস্তবমূখি কর্মপরিকল্পনা। সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কর/ভ্যাট বাবস্থাপনায় আনতে হবে পরিবর্তন। এবারের বাজেটে ভ্যাট এর হার ১৫% থেকে ১০ % এ নামিয়ে আনা হয়েছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। পৃথিবীর কোন দেশেই ৫% থেকে ৭% এর বেশি ভ্যাট আরোপ করা হয় না বরং এই খাতকে বিভিন্নভাবে প্রমোট করা হয়। তাছাড়া এই খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায়ের পণ্য বা সেবার উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নানা ধরণের ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে যা এই শিল্পের বিকাশে অন্তরায়।

এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হলে রেস্টুরেন্ট কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও ভোক্তাদের নিকট সরবরাহকরনে সহায়ক হবে যা দেশের জিডিপিতে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হবে। যেখানে কৃষকেরা এসকল কৃষি পণ্য সহজেই নায্যমূল্যে বিক্রয় করতে পারবে। ফলশ্রুতিতে, দেশের অর্থনীতি হবে আরও সমৃদ্ধ এবং গতিশীল।


আরও পড়ুনঃ বাজেটে গুঁড়ো দুধ উৎপাদন উৎসাহিত ও আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে


মোমিন উদ দৌলা
চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক,
ইয়ন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ।


মতামত / আধুনিক কৃষি খামার



Source by [সুন্দরবন]]

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Recent Posts

© 2022 sundarbon24.com|| All rights reserved.
Designer:Shimul Hossain
themesba-lates1749691102