শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন

একজন বাংলা ফন্ট নির্মাতা শিশির ও ‘ফন্টবিডি’ কথকতা

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২১

তরুণ শরীফ উদ্দিন শিশির ইতিমধ্যে ৩৩টি বাংলা ফন্ট তৈরি করেছেন। গ্রাফিক্স আর্টিস্ট শিশির ফন্ট তৈরির পাশাপাশি বাংলা ক্যালিওগ্রাফিও করে থাকেন। তার ফন্ট তৈরি, ব্যবহারসহ নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন টেক শহরের স্পেশাল করসপনডেন্ট নুরুন্নবী চৌধুরী

১৯৫২ সালে ভাষা নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মনে রেখে এবং নিজেদের ভাষার লিপির অগ্রগতির কথা চিন্তা করে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ফন্ট তৈরি করে ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন চট্টগ্রামের তরুণ শরীফ উদ্দিন শিশির। শুধুমাত্র ফন্ট তৈরিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে নিজের তৈরি ফন্টের পাশাপাশি আরো যারা ফন্ট নির্মান করছেন তাদের তৈরি ফন্টগুলো এক জায়গায় রাখতে শুরু করেন ‘ফন্টবিডি’ নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। যেখানে যেমন রয়েছে বিনামূল্যের ফন্ট, তেমনি রয়েছে প্রিমিয়াম ফন্ট। এ উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এ ওয়েবসাইটে নিজের তৈরি করা ছাড়াও অনেক ফন্ট নির্মাতার তৈরি ফন্ট পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে এ সাইটে এখন রয়েছে ৯৩টি ফন্ট। এসব ফন্ট ডাউনলোড হয়েছে প্রায় ৯ লাখ।

বাংলা ফন্টের ওয়েবসাইট ফন্টবিডি

শুরুর গল্প

কিভাবে বাংলা ফন্ট তৈরিতে যুক্ত হয়েছেন জানতে চাইলে শিশির বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আঁকাআকির প্রতি অনেক ঝোঁক ছিল এবং লিখতে অনেক ভালোবাসতাম। এখনো ভালোবাসি। সেই ভালোলাগা থেকে এখন আমি হাতের লেখা শেখারও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।’ চট্টগ্রামের হালিশহর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের হাতের লেখা বিষয়ের শিক্ষক শিশির বলেন, হাতের লেখা আমার একটা নেশাও। আর তাই যেখানেই সুযোগ পেয়েছি সেখানেই লিখেছি। মানুষের তো অনেক ধরনের শখ থাকে। আমার সবচেয়ে থেকে পছন্দের শখই ছিল লেখালেখি বা আর্ট করা।’ আর লেখালেখির প্রতি ভালবাসাটা থেকেই একসময় ব্যানার, সাইনবোর্ড লেখা, ছবি আঁকা ইত্যাদির মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পড়েন তিনি।

শিশির বলেন, গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করতে গিয়েই মনে হয়, প্রতিটি ডিজাইনের সৌন্দর্যবর্ধন করে একটি সুন্দর সাজানো গোছানো লেখা যেটাকে এখন আমরা বলি ‘টাইপোগ্রাফি’। আমার প্রতিটি ডিজাইন করার সময়ই মনে হতো প্রতিটি লেখা বা অক্ষর ভিন্নভাবে লিখতে পারলে ডিজাইনটায় নতুন কিছু হতে পারে। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন আন্দোলন চলছিল তখন আমি একটি টাইপোগ্রাফি করি এবং ‘মাত্রা’ নামক ফেইসবুক পেজে সেটাকে শেয়ার করি। আমার সেই শেয়ার করা পোস্টের কমেন্টে আপনার করা টাইপোগ্রাফির বেশ প্রশংসা পাই। সেখান থেকেই আহমেদ শরীফ ও রায়হান নামে দুইজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় যারা আমার টাইপোগ্রাফিকে বাংলা ফন্ট হিসেবে ডেভলপিং করে দেয়ার কথা বলে। সেই থেকেই আমার বাংলা ফন্ট তৈরির শুরুটা। সেই শুরু এবং ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর নিজের তৈরি করা প্রথম ফন্ট ‘শরিফ শিশির’ ক্যালিগ্রাফি ও হাতের লেখা ফন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়। খুব স্বল্প সময়েই ফন্টটি বেশ জনিপ্রয়তা পায়।

বাংলা ফন্টের জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশে এখন অনেকেই বাংলা ফন্ট তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিষয়টি কিভাবে দেখেন জানতে চাইলে শিশির বেশ আশাবাদের কথা জানালেন। বললেন, ‘ফন্ট তৈরি একটি ক্রিয়েটিভ কাজ। শখ থেকে শুরু হলেও এখন অনেকেই একে পেশা হিসেবেও নিচ্ছেন।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানালেন, আসলে প্রত্যেকটা শিল্পের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে, ঠিক তেমনি ফন্ট ডেভলপ বা ফন্ট তৈরি করা এটাও একটি শিল্প এবং এটারও কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। যেমন ফন্ট দুই ধরনের হয়ে থাকে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘স্ক্রিপ্ট ফন্ট’, অন্যটি হচ্ছে ‘কারসিভ ফন্ট’। এর মধ্যে স্ক্রিপ্ট ফন্ট বেশি ব্যবহৃত হয় এবং এ ফন্টগুলোকে প্যারাগ্রাফ বা বিভিন্ন পত্রিকা, বই, ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে কারসিভ ফন্ট বা স্টাইলিশ ফন্ট সব জায়গায় ব্যবহারযোগ্য না। বিশেষ করে স্টাইলিশ লেখা বা টাইপোগ্রাফির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এ ফন্ট। যেহেতু এটি একটি সত্যিকার অর্থেই ক্রিয়েটিভ কাজ তাই এ শিল্পকে পেশা হিসেবে গ্রহণকারীদের উৎসাহী করতেই আমরা নানা উদ্যোগও নিয়েছি। ফন্ট পাইরেসি রোধ করার পাশাপাশি বিষয়টিকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়ার কাজটিও চলছে।

সংখ্যায় ৩৩

শিশিরের নিজের তৈরি ফন্টের সংখ্যা ৩৩টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শরীফ তিস্তা’, ‘শরীফ জনতা’, ‘শরীফ সুবর্ণ’, ‘শরীফ মিতালী’, ‘শরীফ স্বন্দীপ’, ‘শরীফ বঙ্গবন্ধু’, ‘শরীফ আদর’, ‘শরীফ শিশির’ ইত্যাদি। ফন্টের নামের ক্ষেত্রে কোন দিক বিবেচনায় নেন জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমান বাংলা ফন্টের সংখ্যা হাজার পার করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজের নামের পাশাপাশি এলাকার নামেও ফন্ট তৈরি করেছি। যেমন আমার বাবার নামে ‘শরীফ শাহজাহান’, মায়ের নামে ‘শরীফ হাবিবা’, আমার বোনের নামে ‘শরীফ জোসনা’ (আপকামিং) তৈরি করেছি।

শরীফ উদ্দিন শিশিরের তৈরি কিছু বাংলা ফন্ট

বাংলা ফন্ট ও ভবিষ্যৎ

যেহেতু বাংলার ব্যবহার আগের চেয়ে বাড়ছে তাই অনেকেই ফন্ট তৈরিতে আগ্রহী। পেশা হিসেবেও নিচ্ছেন কেউ কেউ। তবে শুরুতে  অনেকে হতাশায় ভোগেন। বিশেষ করে বর্তমানে অনেকেই ফন্ট পাইরেসি দেখে হতাশ হচ্ছেন। এক্ষেত্রে হতাশ না হয়ে নিজের কাজটি করে যাওয়া হলো মূল বিষয়। আর ফন্টের চাহিদা যত বাড়বে ততই এর বাজার বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি। নতুন যারা আগ্রহী তাদের বাংলা ফন্ট তৈরির বিশেষ কোর্সও শুরু করেছেন জানিয়ে শিশির জানান, কেউ যদি বাংলা ফন্ট তৈরি করতে আগ্রহী হন তাদের জন্য বিশেষ কোর্সও রয়েছে।

বাংলায় এখন আসকি এবং ইউনিকোড দুই ধরনেরই ফন্ট পাওয়া যাচ্ছে। নিত্য নতুন নানা নকশার এসব ফন্ট অনেকেই ব্যবহার করছেন। নতুন ফন্ট নির্মাতাদের হাতে তৈরি নতুন নতুন নকশার আরো বাংলা ফন্ট তৈরি হবে সেটিই স্বপ্ন দেখছেন তরুণ ফন্ট নির্মাতা শরিফ উদ্দিন শিশির।




Source by [author_name]

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Recent Posts

© 2022 sundarbon24.com|| All rights reserved.
Designer:Shimul Hossain
themesba-lates1749691102