শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:১৮ অপরাহ্ন

শরণখোলা উপজেলার নামকরনের ইতিহাস ও ঐতিয্য

  • Update Time : শনিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২২

শরণখোলা উপজেলার পটভূমিঃ ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ভোলা নদীর পূর্ব তীরে ৪ টি ইউনিয়ন ও ৪৪ টি গ্রামের সমন্বয়ে শরণখোলা নামক থানাটি স্থাপিত হয়। মোড়েল জমিদারদের আমলে বরিশাল থেকে আগত বিভিন্নভাবে বিপদগ্রস্থ শরনার্থী মানুষ এ এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করতো বলে এ অঞ্চলটি শরণখোলা নামে পরিচিতি লাভ করে। সুন্দরবনের সম্পদ সংরক্ষণ ও এ অঞ্চলের শান্তি শৃংখলা রক্ষার্থে থানাটির সৃষ্টি হয়। বিংশ শতাব্দীর সপ্তম শতকে বর্তমান স্থানে শরণখোলা থানা স্থানান্তরিত হয়। কালক্রমে ১৯৮৩ সালে শরণখোলা থানা শরণখোলা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।পূর্বে এ উপজেলা খুলনা জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৯৮৪ সালে বাগেরহাট জেলা গঠিত হবার পর শরণখোলা উপজেলা বাগেরহাট জেলার অন্তর্গত হয়

শরণখোলা উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১। ইতিহাস:- এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৮৬১ সালের দিকে বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ অঞ্চল ছিল বলেশ্বর নদীর পূর্ব পাড় ঘেসে ঐতিহ্যবাহি সুন্দরবন । এই অঞ্চলে পার্শ্ববতী বিভাগ বরিশাল থেকে আগত পূর্ব পুরুষেরা জঙ্গল কেটে জনপথ সৃষ্টিসহ বসবাস উপযোগী এলাকা তৈরি করেন। এ জনপদের নাম দেয়া হয় শরণখোলা। শরণখোলা থানা গঠিত হয় ১৮৬১ সালে। ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৮২ সালে শরণখোলা মান উন্নীত থানায় পর্যাদা পায়।

১৮ জুলাই ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় সরকার ( থানা পরিষদ এবং থানা প্রশাসন পূর্নাগঠন হয়) অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর দ্বিতীয় সংশোধনী জারি হওয়ার পর সকল মান উন্নীত থানা উপজেলায় রুপান্তরিত হয়। ঐ আদেশের বলে, শরণখোলা মান উন্নীত থানাও শরণখোলা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।

এ উপজেলার বৃহত্তম অংশ জুড়ে রয়েছে গহীন সুন্দরবন। ঐতিহাসিক ঘটনাবলির মধ্যে রয়েছে ১৯৬৫ সালে লবণাক্ততার হাত থেকে এই অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য নদীর পাশ দিয়ে বেড়িবাঁধ ও খালগুলির মুখে বাধ দেওয়া হয়। ফলে পানি চলাচল না করার অভাবে এই অঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় যার ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন সরকারের কাছে আবেদন করে প্রতিকার পাবার জন্য কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা না পেয়ে এক পর্যায় স্থানীয় লোকজন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ করে এবং ১৯৬৭ সালের ১০ মার্চ একযোগে রায়েন্দা (সদর), তাফালবাড়ী, কুমারখালী খালের বাঁধ কেটে ফেলে।

প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদ আমড়াগাছিয়া গ্রামের সিংবাড়ির মোহিনী কুটির। এই অঞ্চলে ১৯৮২ সালে প্রথম দিকে সময়ের প্রয়োজনে থানা দপ্তর স্থাপিত হয়। শরণখোলার সুন্দরবনের দূর্নীতি/চোরাচালান/ডাকাতী দমন করার লক্ষ্যে তাফালবাড়ী, বড়রাজাপুর পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনসহ শরণখোলা ফরেষ্ট রেঞ্জ অফিস ও কোষ্টগার্ড ষ্টেশন স্থাপন করা হয়।

১৯৮৫ সালে শরণখোলা উপজেলার সৃষ্টি হয়। শরণখোলা উপজেলায় প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছিলেন তড়িৎকান্তি রায় চৌধুরী। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হওয়ার পর শরণখোলা উপজেল পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোঃ হাবিবুর রহমান।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে এ উপজেলায় অনেক লোকের প্রাণহানিসহ ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাগেরহাট জেলা সদর থেকে শরণখোলা উপজেলা সদরের দূরত্ব নদী পথে ৪৮ কিলোমিটার (৩০) মাইল। ১৯৮৪ খিস্টাব্দে বাগেরহাট জেলা সৃষ্টির পর ছোট বড় খালের উপর সেতু নির্মান পূবক স্থলপথে যোগাযোগ রক্ষা হওয়ায় বাগেরহাট জেলা সদর হতে শরণখোলা উপজেলা সদরের দূরত্ব সড়কপথে হয়েছে ৫০ কিলোমিটার (৩১.৫০) মাইল)।

 শরণখোলার নাম করনের ইতিহাসঃ

(ক) শরণখোলা উপজেলার নামকরণ সম্পর্কে যেটুকু জানা যায়। তা হচ্ছে এ অঞ্চলটি সুন্দরবন অঞ্চলের এক প্রান্তে অবস্থিত এবং এখানে সুন্দরবনের উৎপাদিত কাঠ বিশেষ প্রক্রিয়ার তৈয়ার করা হতো যা একটি ‘স্মরনীয়’ ঘটনা ছিল। জনশ্রুতি আছে যে এই স্মরনীয় ঘটনা থেকে কালক্রমে এই অঞ্চটির নাম হয়েছে শলণখোলা।

(খ) তবে স্থানীয়ভাবে অপর এক তথ্যে শরণখোলা নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়। শরণ শব্দের অথ আশ্রয়; ‘খোলা’ এব অথ স্থান। অর্থাৎ শরণখোলা অর্থ আশ্রয়স্থান। সুন্দরবনে বাঘের উপদ্রব ছিল এবং আছে, এতে কোন সন্দেহ নাই। পূর্বে সুন্দরবনের এ অংশে মানুষ বসবাস করার কোন স্থান ছিলনা।

বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মানুষ গাছে মাচা বেঁধে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ঐ স্থানের কমরত মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে বসবাসের জন্য তাবু বেধেঁ আশ্রয় নেয়। পরবর্তী পর্যায়ে অর্থাৎ তৃতীয় পর্যায়ে মানুষ তাদের জীবনধারায় উন্নায়নের জন্য ঐ অংশে মানুষ তাদের আশ্রয়স্থল ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে।

এভাবে সুন্দরবনের ঐ অংশে মানুষ তাদের আশ্রয়স্থল ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে। এভাবে সুন্দরবনের এই অংশের মানুষ তাদের আশ্রয়স্থানের ব্যবস্থা করায় এর নাম হয় শরনখোলা অর্থাৎ আশ্রয়স্থল। শরণখোলার নামকরণ সম্পর্কে প্রথম মতটির তুলনায় দ্বিতীয় মতটির গ্রহনযোগ্যতা অধিকতর যেহেতু ইহা বাস্তবতায় সহিত সাদৃশ্য বহন করে।

৩। আয়তন:- শরণখোলা উপজেলার মোট আয়তন মোট =১৫১.২৩, কিমি (৫৮.৩৯) বর্গমাইল।

৪। প্রশাসনিক এলাকা

এই উপজেলা চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।
১নং ধানসাগর ইউনিয়ন
২নং খোন্তাকাটা ইউনিয়ন
৩নং রায়েন্দা (সদর) ইউনিয়ন
৪নং সাউথখালী ইউনিয়ন

৫। জনসংখ্যার উপাত্ত:-
শরণখোলার মোট জনসংখ্যা = ১১৪০৮৩;
পুরুষ = ৬১৭৯৯,
মহিলা = ৫২২৮৪,
মুসলিম ১,০১৯৮১, হিন্দু ১২,০৫৬, বৌদ্ধ ১৫ এবং অন্যান্য ৩ ।

৬। শিক্ষা
শরণখোলায় শিক্ষার গড় হার৫৬%;
পুরুষ ৫৪%,
মহিলা৫৮.৪%

উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: কলেজ, হাইস্কুল, প্রথমিক বিদ্যালয়।

(ক) কলেজ সমূহঃ
১। শরণখোলা ডিগ্রি কলেজ (১৯৭৮),
২। তাফালবাড়ি স্কুল এন্ড কলেজ।
৩। ডি.এন কারীগারি কলেজ ।
৪। মাতৃভাষা কলেজ ।

(খ) হাইস্কুল সমূহঃ
১। রায়েন্দা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪৭),
২। তাফালবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৭৯),
৩। আমড়াাগাছিয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৫০),
৪। খোন্তাকাটা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৬৫),
৫। আর.কে.ডি.এস বালিকা বিদ্যালয় (১৯৬৯)
৬। রাজাপুর (১৯৬৮)
৭। ধানসাগর (১৯৬৮)
৮। জনতা (১৯৬৯)
৯। সুন্দরবন (১৯৮০)
(গ) প্রথমিক বিদ্যালয় সমূহঃ
১। খেজুরবাড়িয়া (১৯৩১)
২। গোলবুনিয়া (১৯৩৬)
৩। আমড়াগাছিয়া (১৯৪০)
৪। রায়েন্দা (১৯৪০)
৫। সাউথখালী (১৯৪০)
৬। আমড়াগাছিয়া (১৯৫২)
৭। দঃ নলবুনিয়া (১৯৫২)
৮। মঠেরপাড় (১৯৫২)
৯। দঃ রাজাপুর (১৯৫২)
১০।রাজৈর (১৯৫৭)
১১। সোনাতলা (১৯৭১)

৭। অর্থনীতি
এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রধান প্রধান আয়ের উৎস
কৃষি ৫১.৮৫%,
অকৃষি শ্রমিক ৯.৬৯%,
পরিবহণ ও যোগাযোগ ২.৯%,
শিল্প ০.৭%,
নির্মাণ ১.৬৮%,
ব্যবসা ১৬.২৪%,
চাকরি ৬.৫৬%,
ধর্মীয় সেবা ০.৪২%,
রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.৬১%
অন্যান্য ৯.৪৫%
কৃষিভূমির মালিকানা
ভূমি-মালিক ৪৮.৭৪%,
ভূমিহীন ৫১.২৬%
শহরে ৪৪.৩৫% এবং গ্রামে ৫০.০৩% পরিবারের কৃষিজমি রয়েছে।

৮। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (উল্লেখযোগ্য)

মসজিদ ২১৯, মন্দির ৭২, উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
১।হাজী সুন্দর মোল্লা দফাদার বাড়ী জামে মসজিদ (১৮৮২),
২। উত্তর খোন্তাকাটা নলেমিয়া জামে মসজিদ (১৮৯৮),
৩।ধানসাগর মোল্লাবাড়ী জামে মসজিদ (১৯০৫),
৪। ধানসাগর রাধাগোবিন্দ মন্দির,
৫।আমড়াাগাছিয়া কালী মন্দির,
৬।রায়েন্দা শীতলা কালী মন্দির।

৯। ভাষা: শরণখোলা উপজেলা অঞ্চলে বনজঙ্গল কেটে জনপদ গড়ে উঠেছিল। এই উপজেলার অধিবাসীদের মধ্যে বরিশাল অঞ্চলের, আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব দেখা যায়। পার্শ্ববর্তীবিভিন্ন বিভাগ বরিশাল হতে আগত ব্যাক্তিবর্গের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবে এ অঞ্চলের বিভিন্ন জনপদের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। এই অঞ্চলের অধিবাসীদের একটি সাধারণ আঞ্চলিক ভাষায় চিহ্নিত করা খুবই কঠিন।

১০। সংস্কৃতি: এ উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি পরিবার আর্দশ পরিবারের দৃষ্টান্ত। কৃষি, মৎস্যচাষ, সাগর ও নদীতে মৎস্য আহরন, সুন্দরবন থেকে মাছ, মধু ,কাকড়া, গোলপাতা, জ্বালানী কাঠ, ইত্যাদি সংগ্রহ করাই তাদের প্রধান পেশা। হিন্দু, মুসলমান E.T.C, সব যুগের প্রভাবে এ থানায় মিশ্র সংস্কৃতিগড়ে উঠেছে।

মোরগ ডাকা ভোরে আড়মোড় ভেঙ্গে এখানে শুরু হয় দিনের নিত্যকার্যক্রম। পুরুষহাল, বৈঠা,জাল নিয়ে নিত্য কর্মে বেড়িয়ে পড়ে। নারী মন দেয় গৃহ কাজে। পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও এগিয়ে রয়েছে। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমও র্দীঘদিনের। পরিবারের প্রধান পুরুষ। নারী রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। গ্রামাঞ্চলে মহিলারা শাড়ি পড়ে।

কনেকে নিজ হাতে সিঁদুর পরালে মঙ্গল বেশী হয় বিবেচনায় বিবাহিত হিন্দু নারীরা স্বামীর হাতে সিঁদুর পরতে পছন্দ করে। গ্রামাঞ্চলের পুরুষরা লুঙ্গি পরে। পুরুষরা সর্বত্র শার্ট পরে। শারদীয় দুর্গা উৎসব ও ঈদে উভয় সম্প্রদায়কে বর্ণাঢ্য পোষাক পড়ে মজা করে থাকে।

১০। দর্শনীয় স্থান সুন্দরবন (বগী বন্দর রেঞ্জ অফিস) শরণখোলা উপজেলা থেকে বগী যাওয়ার জন্য মটর সাইকেল যোগে অথবা বাসে উপজেলা থেকে তাফালবাড়ী পর্যন্ত তারপর তাফালবাড়ী বাজার থেকে মটর সাইকেল,ভ্যান,অটো রিক্সা যোগে বগী ফরেষ্ট অফিসে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

কটকা অভ্যয়ারন্য কটকা অভয়ারণ্যে যেতে চাইলে আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে সুন্দরবন অঞ্চলে (খুলনা, বাগেরহাট, মোংলা, শরণখোলা)। কটকায় বেড়াতে যাবার প্রধান মাধ্যম বলতে গেলে শুধুই লঞ্চ।

আর পর্যটকদের নিয়ে এই লঞ্চ নোঙ্গর করা হয় বগি খালে।বর্তমানে ছোট-বড় শতাধিক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসায় কাজে নিয়োজিত আছে। যেকোনো ভাল ট্যুর কোম্পানির সাথে চুক্তি করে সুন্দরবনে যাওয়া যায়। সুন্দরবনে যাওয়ার পর ট্যুর কোম্পানির লোকদের সহায়তায় যেতে পারবেন কটকায়।

রাজধানী ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে খুলনা, বাগেরহাটগামী বাস কিংবা কমলাপুর ট্রেনে করে খুলনা এসে রুপসা বা বাগেরহাটের মংলা থেকে পাবেন লঞ্চ। এছাড়া (খুলনা, বাগেরহাট, মোংলা, শরণখোলা) থেকে পাবেন সুন্দরবনে যাওয়ার নৌযান। যদি কোন তথ্যে ভুল হয়ে থাকে জানাবেন। কোন ধরনের ভুল হলে বলবেন ঠিক করে দিবো।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Recent Posts

© 2022 sundarbon24.com|| All rights reserved.
Designer:Shimul Hossain
themesba-lates1749691102