সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

‘জয়িতা’ শত বাধা পেরিয়ে শরণখোলার তিন নারীর সফলতার গল্প!

  • Update Time : শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সুন্দরবন ডেক্স: আমাদের এই পূরুষ শাসিত সমাজে একসময় নারীরা ছিলো অবহেলিত। কিন্তু এই কথাটি এখন আর প্রযোজ্য নয় আমাদের দেশ ও সমাজে। নারীরা এখন হিমালয় জয় করছেন। শিক্ষা-দীক্ষায়, ক্রীড়া নৈপুণ্য, উন্নয়ন সবক্ষেত্রেই পুরুষের সাথে সমানতালে এগোচ্ছেন নারীরা।

দেশ-বিদেশে নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন একসময়ের কথিত অবহেলিত সেই নারীরাই। এমনই শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অবহেলা, বঞ্ছনা আর নির্যাতন সহ্য করে বাগেরহাটের শরণখোলার তিন নারী আজ সফল। এবছরের জয়িতা হলেন তারা।

‘সফল জননী গোলেনুর বেগম’
বাগেহাটের শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের সুন্দরবনঘেঁষা দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুল গণির স্ত্রী গোলেনূর বেগম। তার তিন ছেলে ও ছয় মেয়ের মধ্যে প্রথম সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরুজ্জামান ৭১সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন। একারণে গোলেনূর বেগম একজন শহীদ জননীও।

যুদ্ধের পরই তার স্বামী মারা যান। স্বামী ও বড় সন্তানকে হারিয়ে যুদ্ধের পর গোলেনূর বেগম বাকি ৮ সন্তানকে নিয়ে সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এর পর পরবর্তী সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তবু দমে যাননি এই শহীদ জননী। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদের সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি। দুই ছেলের মধ্যে মেজ ছেলে মো. হাছান উজ্জামান ডক্টরেট ডিগ্রি প্রাপ্ত।

তিনি বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। ছোট ছেলে মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জাম অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত। এছাড়া ছয় মেয়ের মধ্যে মেহেরুন্নেছা ভিকারুন নেছা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক। দুই মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং এক মেয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক থেকে অবসর গ্রহন করেছেন। অন্য দুই মেয়ে গৃহিনী। গোলেনূর বেগমের যৌবনের সোনালী সময় দুঃস্বপ্নে কাটলেও এখন তিনি মহাসুখী। জীবনের শেষ সময়ে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কাছেই সানন্দে দিন কাটছে শতবর্ষী এই মায়ের।

‘সমাজ উন্নয়নে রেকসোনা বেগমের অসামান্য অবদান’

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রামের সদ্য প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন আকনের সঙ্গে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় রেকসোনা বেগমের। বিয়ের তিন বছরেই দুই সন্তানের মা হন তিনি।

স্বামী ছিলেন দুই বারের ইউপি সদস্য। এজন্য স্বামীর সহযোগী হিসেবে তাকেও বিভিন্ন সামাজিক কাজ সামলানো ও আচার-অনুষ্ঠানে অংগ্রহন করতে হতো। এর সুবাদে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সমাজের অসহায় মানুষের দুরাবস্থা। দেখেছেন নানা অসংগতি। সেই থেকে তার আগ্রহ জাগে সমাজকর্মী হওয়ার। ধীরে ধীরে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন সামাজিক কাজে। একসময় অসহায় মানুষের ভরসার স্থলে পরিণত হন রেকসোনা বেগম। এর পর ২০০৮ সালে খোন্তাকাটা ইউনিয়নের সংরিক্ষত মহিলা আসন থেকে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন।

বর্তমানে তিনি উপজেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। মহিলা নেত্রী হিসেবে তিনি নারী উন্নয়ন, বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ নানা সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। রেকসোনা বেগমের এক মেয়ে, দুই ছেলে। একমাত্র মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত। বর্তমানে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের অফিসার পদে কর্মরত। বড় ছেলে অনার্সে এবং ছোট ছেলে ১০ শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।

‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেন মাজেদা বেগম’:

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের জাহিদুল ইসলাম মোস্তফার সঙ্গে নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ২০০১ সালে বিয়ে হয় মাজেদা বেগমের। বিয়ের চার বছরের মধ্যে একটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এর পর থেকে স্বামী নানা অজুহাতে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন।

একপর্যায়ে ২০১৫ সালে স্বামী আরেকটি বিয়ে করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে এসে ওঠেন। তখন দিশাহারা হয়ে পড়েন মাজেদা বেগম। শেষমেশ স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের যন্ত্রনা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে নিজের জীবন ও সন্তানদের মায়া ত্যাগ করে বিষ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মাজেদা বেগম। পরে চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এর কিছুদিন পরই দুই সন্তানসহ তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন স্বামী। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্যদের কাছে বিচার চেয়েও কোনো লাভ হয়নি। এর পর থেকেই দুই সন্তান নিয়ে জীবন সংগ্রাম শুরু হয় মাজেদার। প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। বর্তমানে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি করেন মাজেদা বেগম।

সেখান থেকে যা বেতন পান তা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার খরচ চলে তার। স্বামী তাদের কোনো খোঁজখবর নেন না। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়েই থাকেন। এখন বেশ সুখেই কাটছে মাজেদা বেগমের সংগ্রামী জীবন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Recent Posts

© 2022 sundarbon24.com|| All rights reserved.
Designer:Shimul Hossain
themesba-lates1749691102